সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
******
♥♥ভালবাসি, ভালবাসি♥♥
—সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
ধরো কাল তোমার পরীক্ষা,রাত জেগে পড়ার
টেবিলে বসে আছ,
ঘুম আসছে না তোমার
হঠাত করে ভয়ার্ত কন্ঠে উঠে আমি বললাম-
ভালবাস? তুমি কি রাগ করবে?
নাকি উঠে এসে জড়িয়ে ধরে বলবে,
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো ক্লান্ত তুমি, অফিস থেকে সবে ফিরেছ,
ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত পীড়িত..
খাওয়ার টেবিলে কিছুই তৈরি নেই,
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ঘর্মাক্ত আমি তোমার
হাত ধরে যদি বলি- ভালবাস?
তুমি কি বিরক্ত হবে?
নাকি আমার হাতে আরেকটু
চাপ দিয়ে বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো দুজনে শুয়ে আছি পাশাপাশি,
সবেমাত্র ঘুমিয়েছ তুমি
দুঃস্বপ্ন দেখে আমি জেগে উঠলাম শশব্যস্ত
হয়ে তোমাকে ডাক দিয়ে যদি বলি-ভালবাস?
তুমি কি পাশ ফিরে শুয়ে থাকবে?
নাকি হেসে উঠে বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি দুজনে,মাথার উপর
তপ্ত রোদ,বাহন
পাওয়া যাচ্ছেনা এমন সময় হঠাত দাঁড়িয়ে পথ
রোধ করে যদি বলি-ভালবাস?
তুমি কি হাত সরিয়ে দেবে?
নাকি রাস্তার সবার দিকে তাকিয়ে কাঁধে হাত
দিয়ে বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো শেভ করছ তুমি,গাল কেটে রক্ত পড়ছে,এমন সময়
তোমার এক ফোঁটা রক্ত হাতে নিয়ে যদি বলি-
ভালবাস?
তুমি কি বকা দেবে?
নাকি জড়িয়ে তোমার গালের রক্ত আমার
গালে লাগিয়ে দিয়ে খুশিয়াল
গলায় বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো খুব অসুস্থ তুমি,জ্বরে কপাল পুড়ে যায়,
মুখে নেই রুচি, নেই কথা বলার
অনুভুতি,
এমন সময় মাথায় পানি দিতে দিতে তোমার
মুখের
দিকে তাকিয়ে যদি বলি-ভালবাস?
তুমি কি চুপ করে থাকবে?নাকি তোমার গরম
শ্বাস আমার
শ্বাসে বইয়ে দিয়ে বলবে ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো যুদ্ধের দামামা বাজছে ঘরে ঘরে,প্রচন্ড
যুদ্ধে তুমিও অঃশীদার,
শত্রুবাহিনী ঘিরে ফেলেছে ঘর
এমন সময় পাশে বসে পাগলিনী আমি তোমায়
জিজ্ঞেস করলাম-
ভালবাস? ক্রুদ্ধস্বরে তুমি কি বলবে যাও?
নাকি চিন্তিত আমায় আশ্বাস
দেবে,বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো দূরে কোথাও যাচ্ছ
তুমি,দেরি হয়ে যাচ্ছে,বেরুতে যাবে,হঠাত
বাধা দিয়ে বললাম-ভালবাস? কটাক্ষ করবে?
নাকি সুটকেস ফেলে চুলে হাত
বুলাতে বুলাতে বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি
ধরো প্রচন্ড ঝড়,উড়ে গেছে ঘরবাড়ি,আশ্রয় নেই
বিধাতার দান এই
পৃথিবীতে,বাস করছি দুজনে চিন্তিত তুমি
এমন সময় তোমার
বুকে মাথা রেখে যদি বলি ভালবাস?
তুমি কি সরিয়ে দেবে?
নাকি আমার মাথায় হাত রেখে বলবে
ভালবাসি, ভালবাসি..
ধরো সব ছেড়ে চলে গেছ কত দুরে,
আড়াই হাত মাটির নিচে শুয়ে আছ
হতভম্ব আমি যদি চিতকার করে বলি-ভালবাস?
চুপ করে থাকবে?নাকি সেখান থেকেই
আমাকে বলবে ভালবাসি, ভালবাসি..
যেখানেই যাও,যেভাবেই থাক,না থাকলেও দূর
থেকে ধ্বনি তুলো
ভালবাসি, ভালবাসি, ভালবাসি..
দূর থেকে শুনব তোমার কন্ঠস্বর,বুঝব
তুমি আছ,তুমি আছ
ভালবাসি, ভালবাসি...
******
******
******
♥দেখা♥
→সুনীল গংগোপাধ্যায়←
ভালো আছো?
- দেখো মেঘ বৃষ্টি আসবে।
ভালো আছো?
- দেখো ঈশান কোনের আলো, শুনতে পাচ্ছো ঝড়?
ভালো আছো?
-এইমাত্র চমকে উঠলো ধপধপে বিদ্যুৎ ।
ভালো আছো?
- তুমি প্রকৃতিকে দেখো।
- তুমি প্রকৃতি আড়াল করে দাঁড়িয়ে রয়েছো।
আমিতো অণুর অণু, সামান্যর চেয়েও সামান্য।
তুমি জ্বালাও অগ্নি, তোল ঝড়, রক্তে এতো উন্মাদনা।
- দেখো সত্যিকার বৃষ্টি, দেখো সত্যিকার ঝড়।
তোমাকে দেখাই আজোশেষ হয়নি,
তুমি ভালো আছো
*****
*****
****
♥♥♥
" হঠাৎ নীরার জন্য "
/— সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
বাস স্টপে দেখা হলো তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল স্বপ্নে
বহুক্ষণ দেখেছি ছুরির মতো বিঁধে থাকতে সিন্ধুপারে–
দিকচিহ্নহীন–
বাহান্ন তীর্থের মতো এক শরীর, হাওয়ার ভিতরে
তোমাকে দেখছি কাল স্বপ্নে,
নীরা, ওষধি স্বপ্নের
নীল দুঃসময়ে।
দক্ষিণ সমুদ্রদ্বারে গিয়েছিলে কবে,
কার সঙ্গে? তুমি
আজই কি ফিরেছো?
স্বপ্নের সমুদ্র সে কী ভয়ংকর,ঢেউহীন, শব্দহীন, যেন
তিনদিন পরেই আত্মঘাতী হবে, হারানো আঙটির মতো দূরে
তোমার দিগন্ত, দুই উরু ডুবে গেছে নীল জলে
তোমাকে হঠাত্ মনে হলো কোনো জুয়াড়ির সঙ্গিনীর মতো,
অথচ একলা ছিলে, ঘোরতর স্বপ্নের ভিতরে তুমি একা।
এক বছর ঘুমোবো না, স্বপ্নে দেখে কপালের ঘাম
ভোরে মুছে নিতে বড় মূর্খের মতন
মনে হয়
বরং বিস্মৃতি ভালো, পোশাকের
মধ্যে ঢেকে রাখা
নগ্ন শরীরের মতো লজ্জাহীন, আমি
এক বছর
ঘুমোবো না, এক বছর স্বপ্নহীন জেগে বাহান্ন তীর্থের মতো
তোমার ও-শরীর ভ্রমণে পুণ্যবান হবো।
বাসের জানালার পাশে তোমার সহাস্য মুখ, ‘আজ যাই,
বাড়িতে আসবেন!’
রৌদ্রের চিৎকারে সব শব্দ ডুবে গেল।
‘একটু দাঁড়াও’, কিংবা ‘চলো লাইব্রেরির মাঠে’, বুকের ভিতরে
কেউ এই কথা বলেছিল, আমি মনে-পড়া চোখে
সহসা হাতঘড়ি দেখে লাফিয়ে উঠেছি, রাস্তা, বাস, ট্রাম, রিকশা, লোকজন
ডিগবাজির মতো পার হয়ে, যেন
ওরাং উটাং, চার হাত-পায়ে ছুটে
পৌঁছে গেছি আফিসের লিফ্টের দরজায়।
বাস স্টপে তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল দেখেছি স্বপ্নে বহুক্ষণ।
****
****
****
নির্মলেন্দু গুণ
♥ভালোবাসার জন্য ছুটি♥
-নির্মলেন্দু গুণ
গতকাল সিন্ধান্ত নিয়েছি,আমি আবার
ভালবাসবো।
ভেবেছিলাম আমি আর কাউকে ভালবাসবো
না,কিন্তু
তোমাকে দেখার পরই আমি আমার সিদ্ধান্ত
পাল্টেছি,
আমি আবার কিছুদিনের জন্য তোমাকে
ভালবাসবো।
তোমাকে দেখার পর থেকে আমার কেবলই
মনে হচ্ছে,
তোমাকে আমার আবার ও কিছুদিন
ভালোবাসা উচিত।
তাই আমি স্থির করেছি,আমি তোমাকে
ভালোবাসবো
১৯৯৭,১১৯৮,১৯৯৯,এবং ২০০০,-এই চারটি বছর।
আহা ! কী চমৎকার, ভালোই না হবে ঐ চারটি
বছর।
এখন ১৯৯৪ -এর মাঝামাঝি, অর্থাৎ মাঝখানে
থাকলো
১৯৯৫,১৯৯৬, এবং ১৯৯৪ -এর বাকি দিনগুলো
মিলে
মোটমাট আড়াই বছর সময়,প্রায় নয়শ' দিনের
মতো।
ঐ সময়টা তোমাকে একটু অপেক্ষা করে
থাকতে হবে,
আমি জানি,আমার জন্য অপেক্ষার যন্ত্রণা
কী কঠিন-
কিন্তু কিছুই করার নেই,আমি অপ্রাপ্তবয়স্ক
অপ্রস্তুত
যুবকের মতো তোমাকে আর ভালোবাসতে চাই
না।
ইতিমধ্যে যেসব নারীর সঙ্গে আমি নিজেকে
জড়িয়েছি,
তাদের শিকড়গুলো ক্রমশ ছিঁড়ে ফেলবো মন
থেকে।
তাদেরকে বলবো,তোমরা এখন যে যার পথ
দেখো,
আমার লোক আসছে,আমাকে আর বিরক্ত
করো না।
স্ত্রী ও সন্তানদের ডেকে বলবো এই ধরো
তোমাদের
চার বছরের খাই-খরচের টাকা,আমাকে বাধা
দিও না,
শতাব্দীর শেষ চারটি বছরের জন্য আমি চলে
যাচ্ছি
আমার সোনার কাছে।হ্যা,তুমি আমার সোনাই
তো!
ধরো ১৯৯৪ এর ছয় মাস,তারপর ১৯৯৫ এবং১৯৯৬,
মাঝখানে আড়াই বছর;তারপর শুরু হবে
আমাদের
একটানা চারবছরের প্রেম, প্রিয়তমা, তুমি কি
পারবে না
তোমার স্বামী ও সংসার থেকে ঐ ক'দিনের
ছুটি নিতে?
****
****
********
♥♥♥♥♥
তোমার চোখ এত লাল কেন?
↓
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক,
শুধু ঘরের ভিতর থেকে দরোজা খুলে দেবার জন্য।
বাইরে থেকে দরোজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত।
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ আমাকে খেতে দিক।আমি হাতপাখা নিয়ে
কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না,
আমি জানি, এই ইলেক্ট্রিকের যুগ
নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী-সেবার দায় থেকে।
আমি চাই কেউ একজন আমাকে জিজ্ঞেস করুক:
আমার জল লাগবে কিনা, নুন লাগবে কিনা।
পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরও একটা
তেলে ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কি না।
এঁটো বাসন গেজ্ঞি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি।
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন ভিতর থেকে আমার ঘরের দরোজা
খুলে দিক।কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক।
কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে
জিজ্ঞেস করুক, তোমার চোখ এত লাল কেন?
****
****
***
***
♥আবার যখনই দেখা হবে♥
আবার যখনই দেখা হবে, আমি প্রথম সুযোগেই
বলে দেব স্ট্রেটকাটঃ ‘ভালোবাসি’।
এরকম সত্য-ভাষণে যদি কেঁপে ওঠে,
অথবা ঠোঁটের কাছে উচ্চারিত শব্দ থেমে যায়,
আমি নখাগ্রে দেখাবো প্রেম, ভালোবাসা, বক্ষ চিরে
তোমার প্রতিমা। দেয়ালে টাঙ্গানো কোন প্রথাসিদ্ধ
দেবীচিত্র নয়, রক্তের ফ্রেমে বাঁধা হৃদয়ের কাচে
দেখবে নিজের মুখে ভালোবাসা ছায়া ফেলিয়াছে।
এরকম উন্মোচনে যদি তুমি আনুরাগে মুর্ছা যেতে চাও
মূর্ছা যাবে,জাগাবো না,নিজের শরীর দিয়ে কফিন বানাবো।
‘ভালোবাসি’ বলে দেব স্ট্রেটকাট, আবার যখনই দেখা হবে।।।।
#posted by Shakil.


ভালো
ReplyDelete🖤
ReplyDelete